মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

শরীয়তপুর পৌরসভা

রাজধানী থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দক্ষিণে পদ্মার নদীবিধৌত পলল দ্বারা গঠিত শরীয়তপুর জেলার প্রাণকেন্দ্র শরীয়তপুর পৌরসভা। উত্তাল পদ্মার একটি শাখানদী কীর্তিনাশার কোল ঘেঁষে গড়ে উঠেছে শরীয়তপুর পৌর এলাকা। জেলা শহর হিসেবে ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠা পেলেও শরীয়তপুর পৌরসভার ঘোষণা হয় ১৯৮৫ সালের ১৩ই ফেব্রুয়ারী এবং পৌরসভার দপ্তরের উদ্বোধন করতে আসেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তৎকালীন সংস্থাপন সচিব মো: শামসুল হক চিশতী।  

বহুকাল আগে এই অঞ্চল বঙ্গদেশের রত্নভূমি বৃহত্তর বিক্রমপুর পরগণার অন্তর্গত ছিল। পরবর্তীতে ব্রিটিশ শাসনামলে বাকেরগঞ্জ জেলার অংশ করা হলেও শেষ পর্যন্ত সুদীর্ঘ সময় ধরে এটি ছিল বৃহত্তর ফরিদপুর জেলাধীন মাদারীপুর মহকুমার একটি অংশ। ’৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ শুরু হলে ঢাকা বিভাগের অন্তর্গত পূর্ব মাদারীপুরের পালং থানা কে কেন্দ্র করে একটি নতুন মহকুমা গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, পরবর্তীতে যার নাম দেওয়া হয় বাংলায় মুসলিম রেনেসাঁর অগ্রদূত, সমাজ-সংস্কারক ও ব্রিটিশবিরোধী ফরায়েজী আন্দোলনের প্রবক্তা হাজী শরীয়তুল্লাহ্-র নামানুসারে শরীয়তপুর।

বর্তমান ঢাকা বিভাগের অন্তর্গত ২৩১২.৫` উত্তর অক্ষাংশ ও৯০২১`পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত শরীয়তপুর পৌর এলাকার আয়তন ২৪.৭৫ বর্গ কিলোমিটার। শরীয়তপুর সদর উপজেলার প্রায় ২২ টি মৌজা নিয়ে গঠিত শরীয়তপুর পৌরসভা ‘ক’ শ্রেণীতে উন্নীত হয় ২০০৫ সালে। এর পশ্চিমে রয়েছে তুলাসার ও চিতলিয়া ইউনিয়ন, দক্ষিণে আংগারিয়া ও রূদ্রকর ইউনিয়ন, পূর্বে ছয়গাঁও ও পালং ইউনিয়ন এবং উত্তরে ডোমসার ও নশাসন ইউনিয়ন। নদী ছাড়াও বেশকিছু খাল প্রবাহিত হয়েছে শরীয়তপুরের অভ্যমত্মরে। কীর্তিনাশা নদী থেকে রাজগঞ্জ নামের খালটি পৌরসভার উত্তর-পশ্চিম প্রামত্ম হতে পৌরসভার কেন্দ্রভাগে চৌরঙ্গী সংলগ্ন ডাক-বাংলো হয়ে হুগলী-বালুচড়ার সংযোগস্থলে পাকার মাথা নামের একটি স্থানে এসে শেষ হয়। কৃষি ও জলাভূমির আধিক্য চিরহরিৎ শরীয়তপুর জেলা শহরের গ্রামীন পরিবেশ ধরে রাখার জন্য সহায়ক হলেও অতি আধুনিক সময়ের নগরায়নের ছোঁয়া শরীয়তপুরেও লেগেছে। শরীয়তপুর তেমনভাবে শিল্পসমৃদ্ধ না হলেও শহর এলাকার কৃষিজমি কমে আসছে, জলাভূমি ভরাট হয়ে যাচ্ছে, গড়ে উঠছে অসংখ্য আবাসিক ও বাণিজ্যিক ইমারত। প্রকৃতপ্রক্ষি এই এলাকার আর্থ-সামাজিক এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন সূচিত হয় ১৯৯৬ সাল থেকে।

পৌর এলাকার ধানুকা মৌজায় বহু পুরাতন কিছু ইমারত রয়েছে যেগুলোতে প্রাচীন সংস্কৃতির চর্চা ছিল বলে ঐতিহাসিক তথ্য পাওয়া যায়। আজ হতে প্রায় ছয়শত বছর পূর্বে ধানুকা মনসাবাড়ির জয়াদেবীর সংস্কৃত ভাষায় কিছু  রচনার অনুবাদ অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার বিষয়বস্ত্ত। এখানকার জমিদার ও সনাতন ধর্মানুরাগী ময়ূরভট্টের মনসাবাড়ি এখনও প্রাচীন সভ্যতার স্মৃতি বহন করছে। দক্ষিণ বালুচড়া এবং উত্তর বিলাসখানে মুঘল আমলের দুইটি মসজিদ রয়েছে। কুরাশীতে একটি প্রাচীন শিব-মন্দির রয়েছে এবং এই এলাকার পার্শববর্তী দাসার্তায় নিকট অতীতেও কাঁসা-পিতলের প্রচুর কাজ হতো বলে শোনা যায়।

পালং তুলাসার গুরম্নদাস সরকারী উচ্চ বিদ্যালয় ও সরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়সহ অন্যান্য বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাগ্রহণ শেষে উচ্চশিক্ষার জন্য শরীয়তপুর শহরে রয়েছে শরীয়তপুর সরকারী কলেজ ও সরকারী গোলাম হায়দার খান মহিলা কলেজ। এখানে দু’টি গণগ্রন্থাগার রয়েছে জ্ঞান-পিপাসুদের জ্ঞানের তৃষ্ণা মেটাতে। শরীয়তপুর শহরের অধিবাসীদের স্বাস্থ্যসেবা দেয়ার জন্য সদর হাসপাতালের পাশাপাশি গড়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি বেসরকারী হাসপাতাল ও ক্লিনিক। 

শরীয়তপুর পৌরসভা এলাকার তুলাসার মৌজা তথা চার নম্বর ওয়ার্ডের ভূমির গড় উচ্চতা এর আশপাশের এলাকাগুলোর তুলনায় কিছুটা বেশি। এজন্যই প্রাতিষ্ঠানিক স্থাপনাসমূহ এই এলাকায় বেশি চোখে পড়ে। কীর্তিনাশা নদীর উপর কোটাপাড়া সেতু হতে আংগারিয়া পর্যমত্ম পৌরসভার ভিতর দিয়ে সড়ক ও জনপথ বিভাগের  রাস্তা দিয়েই শরীয়তপুরের সাথে এর পার্শ্ববর্তী জেলা মাদারীপুরের যোগাযোগ হয়ে থাকে। পুলিশ লাইন, পানি উন্নয়ন বোর্ড, সড়ক ও জনপথ বিভাগসহ অনেকগুলো সরকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে এ রাস্তার দু’পাশে। পদ্মা নদীর উপর বহু প্রতিক্ষীত সেতুটির নির্মাণকাজ শেষ হলে হয়তো সবচেয়ে লাভবান হবেন শরীয়তপুরবাসীরাই। তখন রাজধানী ঢাকার সাথে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগের জন্য শরীয়তপুরের গুরূত্ব হবে সর্বাধিক।

দেশের অন্যান্য উপকূলীয় অঞ্চলগুলোর মতো শরীয়তপুরও প্রাকৃতিক দুর্যোগপূর্ণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। কৃষিপ্রধান এই এলাকার মানুষ অতীতে বহুবার মুখোমুখি হয়েছে প্রকৃতির বাঁধার সামনে। বর্তমানে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সহায়তায়, স্থানীয় সরকার বিভাগ ও পৌরসভার মেয়র-কাউন্সিলরদের প্রচেষ্টায় শরীয়তপুর এগিয়ে চলছে একটি আদর্শ পৌরসভা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার অপেক্ষায়।

ছবি